Home / সারাদেশ / লাখ টাকার প্যাকেজে সিজার, জন্মেই পঙ্গু হলো নবজাতক

লাখ টাকার প্যাকেজে সিজার, জন্মেই পঙ্গু হলো নবজাতক

চোখ মেলে পৃথিবীর আলো দেখার আগেই পঙ্গু হলো নবজাতক। সিজারের সময় হাত ভেঙে হয়েছে টুকরো। অভিজ্ঞ চিকিৎসকের অনুপস্থিতিতে নবিশ চিকিৎসকদের দিয়ে অপারেশন করানোর কারণেই এ ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ নবজাতকের মা ও স্বজনদের।

ঘটনার পর চিকিৎসার বিল মওকুফ করে মা ও নবজাতককে ছাড়পত্র দিতে চায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। তবে তা প্রত্যাখ্যান করে গুরুতর অবহেলার শাস্তি দাবি করেছেন স্বজনরা।

ঘটনাটি চট্টগ্রামের। বৃহস্পতিবার নগরের পাহাড়তলীর ইমপেরিয়াল হাসপাতালে এ ঘটনা ঘটে। পরে শনিবার হাসপাতালের চেয়ারম্যানের কাছে এ ব্যাপারে লিখিত অভিযোগ দিলে বিষয়টি জানাজানি হয়।

জানা গেছে, বৃহস্পতিবার সকাল ৯টার দিকে অন্তঃস্বত্ত্বা স্ত্রীকে হাসপাতালটিতে ভর্তি করান নগরের ঘাট ফরহাদবেগ এলাকার মোহাম্মদ সালাউদ্দিন। সকাল ১০টার দিকে চিকিৎসক শিরিন ফাতেমার তত্ত্বাবধানে থাকা ওই নারী সিজারের মাধ্যমে পুত্রসন্তানের জন্ম দেন। কিন্তু জন্মের পর শিশুটির বাম হাত অসাড় অবস্থায় দেখতে পেয়ে চিকিৎসকদের কাছে বিষয়টি জানতে চান তার মা-বাবা ও স্বজনরা। জবাবে অপারেশনের সময় অসাবধানতাবশত হাতে ফ্র্যাকচারের কথা স্বীকার করেন চিকিৎসকরা। তবে কী ধরনের ফ্র্যাকচার তা জানতে চাইলে কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি কেউ। পরবর্তীতে এক্সরে করে দেখা গেছে- শিশুটির বাম হাত পুরোপুরি ভেঙে গেছে।

ঘটনার দুইদিন পর শনিবার এ বিষয়ে হাসপাতালের চেয়ারম্যান বরাবর অভিযোগ করেন নবজাতকের বাবা মোহাম্মদ সালাউদ্দিন। এরপরই তাদের চিকিৎসার বিল মওকুফ করে ছাড়পত্র দিতে চায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। তখনই বিষয়টি জানাজানি হয়।

মোহাম্মদ সালাউদ্দিন বলেন, জন্মের পর এনআইসিইউর একজন নারী চিকিৎসক বাচ্চার বাম হাতটি কম নড়াচড়া করছে বলে জানান। কারণ জানতে চাইলে অপারেশনের সময় বাম কনুইয়ের ওপরে ফ্র্যাকচার হয়েছে বলে জানান তিনি। পরে বিকেল ৫টার দিকে একজন অর্থোপেডিক ডাক্তার আসেন। তিনি বাচ্চার ফ্র্যাকচার ৭-১০ দিনের মধ্যে ভালো হয়ে যাবে বলে দুশ্চিন্তা করতে নিষেধ করেন। আমরা বারবার ফ্র্যাকচারের ধরন ও পরিমাণ জানতে চাচ্ছিলাম। কিন্তু তারা ‘বাচ্চা সুস্থ হয়ে যাবে’ বলে সান্ত্বনা দিয়ে মূল বিষয়টি এড়িয়ে যান। সন্ধ্যা ৭টার দিকে কর্তব্যরত এক ডাক্তারের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলাপ করলে বাচ্চার বাম হাতের হাড় ভেঙে টুকরো হয়ে গেছে বলে জানান তিনি।

নবজাতকের বাবা আরো বলেন, শুক্রবার বাচ্চার কোমরে অন্য কোনো সমস্যা আছে কিনা তা জানতে আরো একটি ডায়াগনোসিস করা হয়। কিন্তু সেই ডায়াগনোসিসের ফলাফল আমরা এখন পর্যন্ত জানতে পারিনি। এ অবস্থায় বাচ্চার শারীরিক অবস্থার ব্যাপারে সেকেন্ড ওপিনিয়ন নিতে সকল ডায়াগনোসিস রিপোর্ট সরবরাহের অনুরোধ জানালেও গোপনীয়তা রক্ষার অজুহাতে তা দিতে অস্বীকৃতি জানায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

তিনি বলেন, বাচ্চার অবস্থানে কোনো জটিলতা থাকলে ডেলিভারির আগে ডাক্তার কেন প্রয়োজনীয় ডায়াগনোসিসের সাহায্য নিলেন না? সেকেন্ড ওপিনিয়ন নিতে ডাক্তার কল করতে চাইলেও তারা কেন অনুমতি দিলেন না? আমার বাচ্চার সঙ্গে চরম অবহেলা ও অন্যায় হয়েছে। এত টাকা দিয়ে যদি উন্নত সেবার বদলে হাতই ভেঙে ফেলে, তাহলে মানুষ কাদের ওপর আস্থা রাখবে?

তিনি বলেন, ৯৮ হাজার টাকার প্যাকেজে সিজারের জন্য স্ত্রীকে ভর্তি করাই। কিন্তু অপারেশন চলাকালে অভিজ্ঞ চিকিৎসক শিরিন ফাতেমা উপস্থিত ছিলেন না। তাদের এমন অবহেলা মেনে নেয়া যায় না। আমরা স্বাস্থ্য বিভাগসহ বিভিন্ন জায়াগায় অভিযোগ দিয়েছি। বিষয়টি জানাজানি হলে চিকিৎসার বিল মওকুফ আমাদের ছাড়পত্র দিতে চেয়েছিল হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। কিন্তু আমরা তা প্রত্যাখ্যান করেছি। আমরা এর সঠিক বিচার চাই। শিগগিরই আদালতের দ্বারস্থ হবো।

নবজাতকের মা সাবরিনা সুলতানা জানান, অপারেশন চলাকালে উদ্বিগ্ন কন্ঠে বারবার ডাক্তারদের বলতে শোনা যায়- ‘ম্যাডামকে তাড়াতাড়ি ডাক’। এরপর ডাক্তার শিরিন ফাতেমা অপারেশন থিয়েটারে আসেন।

জানতে চাইলে হাসপাতালটির গাইনোকোলজি বিভাগের প্রধান ডা. শিরিন ফাতেমা বলেন, তিনজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সমন্বয়ে সিজার করানো হয়েছিল। অপারেশন চলাকালে আমি সরাসরি না থাকলেও হাসপাতালের ওটিতে ছিলাম। রোগীর তুলনায় বাচ্চা বড় ও বাচ্চার পজিশন উল্টো ছিল। ফলে ডেলিভারির সময় বাম হাতে ফ্র্যাকচার হয়। রোগীর তুলনায় বাচ্চা বড় হলে এ ধরনের সমস্যা হতে পারে, সেটি বইপত্রেও লেখা আছে।

তিনি আরো বলেন, নবজাতকদের হাড় খুবই নরম থাকে। ফলে ডেলিভারির সময় এ ধরনের ঘটনা ঘটতে পারে। ডেলিভারির পর বিষয়টি তাৎক্ষণিক পরিবারকে জানানো হয়েছিল। তাছাড়া ইম্পেরিয়ালের সব চিকিৎসকই কোয়ালিফায়েড।

ডায়াগনোসিস রিপোর্ট সরবরাহে অস্বীকৃতির বিষয়ে তিনি বলেন, ডায়াগনস্টিক রিপোর্ট পরিবারকে দেখানো হয়েছিল। তবে তারা চেয়েছিলেন বাইরে তৃতীয় কোনো ডাক্তারকে দেখাতে। নিয়ম অনুযায়ী রোগী ভর্তি থাকা অবস্থায় থার্ড কপি বাইরের কাউকে দেওয়া যায় না। তবু তারা এক ডাক্তারকে এনে রিপোর্টগুলো দেখিয়েছেন।

তিনি আরো বলেন, আশা করছি ২-৩ সপ্তাহের মধ্যে হাড়ের সমস্যা ঠিক হয়ে যাবে। বাচ্চাটি সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে যাবে। এ বিষয়ে কনসালটেন্টদের সঙ্গে কথা হয়েছে। পরিবারকে উদ্বিগ্ন না হওয়ার জন্য বিনীতভাবে বোঝানো হয়েছে।

অভিযোগ প্রসঙ্গে ইম্পেরিয়াল হাসপাতালের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. রবিউল হোসেন বলেন, অভিযোগ পেয়ে এর একটি উত্তরও রোগীর অভিভাবকদের জানানো হয়েছে। এর বাইরে আমি আর কিছু জানি না।

Check Also

সাইদুরের মাথাটার কিছুই ছিল না, হেলমেটটা ছিল অক্ষত

স্ত্রী রুনু, সঙ্গে দেড় বছরের সন্তান রেহান ও ৯ বছরের রোহান—সবাইকে বেশ অনিশ্চয়তার মুখে ফেলে …